নারকেল চারা রোপণ ও পরিচর্যা
বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল নারকেল। সাম্প্রতিক সময়ে ডাব ও নারকেলের চাহিদা ও দাম দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। ডাবের দাম ক্ষেত্র বিশেষে একশ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। একই অবস্থা নারকেলের ক্ষেত্রেও। ঢাকার সুপারশপগুলোতে দেড়শ কিংবা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কেটে প্রস্তুত করা নারকেল। নারকেলের পাতা থেকে ঝাড়ু তৈরি করা হয়, যার ভালো চাহিদা ও দাম পাওয়া যায়।
বর্তমান এমন বাস্তবতায় নারকেল হতে পারে একটি উপযুক্ত অর্থকরী ফসল। সঠিক পদ্ধতিতে নারকেলের চারা রোপণ করলে তা এনে দিতে পারে কিছু বাড়তি আয়। আবার পরিকল্পনা করে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা যেতে পারে নারকেল। চলুন জেনে নেওয়া যাক নারকেল চারা কিভাবে রোপণ করবেন:
মাটি নির্বাচন
নারকেল গাছ যেকোনো ধরনের মাটিতে রোপণ করা যেতে পারে। শিলা, কাঁকরময়, লাভা, পিট, বালুময় স্থানেও বিশেষ ব্যবস্থায় নারকেল চাষ উপযোগী করতে তেমন অসুবিধা নেই। বয়স্ক নারকেল গাছের শিকড় ৪ মিটার চওড়া এবং এক মিটার গভীরতায় সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে তেমন প্রয়োজন পড়লে অনাকাক্ষিত এ পরিমাণ অংশের মাটি ও তাতে অন্যান্য বিদ্যমান পদার্থ অপসারণ করে তাতে নারকেল চারা লাগানো সম্ভব। পানি জমে থাকে বা জমি স্যাঁতসেঁতে ভাব থাকে এমন স্থানে নারিকেল চারা রোপণ করা ঠিক হবে না। তবে এ ধরনের নিচু জমিতে (৬ মি.×৭ মি.) দূরত্বে চারা লাগানোর জন্য ‘লে আউট প্লান’ করে নিতে হবে। এরপর দুই সারির মাঝে ৩ মিটার চওড়া এবং ৩০-৬০ সে. মিটার গভীর নালা কেটে নালার মাটি দুই ধারে উঠিয়ে উঁচু করে ৩ মিটার চওড়া উঁচু আইলে চারা রোপণের জন্য উপযোগী হবে।
ওজন কমনো থেকে ত্বকের যত্ন, লাউয়ের যত স্বাস্থ্যগুণ
গর্ত তৈরি
নারিকেলের চারা রোপণের জন্য প্রথমে গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্তের দৈর্ঘ, প্রস্থ ও গভীরতা ১.২ মিটার থেকে ১.৫ মিটার পর্যন্ত করা যেতে পারে। গর্তের নিচের অংশে দুই স্তরে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে ছোবড়ার সমান অংশ নিচে এবং অসমতল অংশ উপরে রেখে সাজিয়ে নিতে হবে। তার উপরে এক ভাগ বেলে দোঁ-আশ মাটি, এক ভাগ পচা গোবরের গুঁড়া, এক ভাগ ছাই এবং এক ভাগ কোকো ডাস্ট দিয়ে অর্ধেক গর্ত পূর্ণ করতে হবে। এ অংশে ৭০-৮০ গ্রাম ফুরাডান/বাসুডিন-১০জি বা অন্য কোনো উঁইপোকা নিধন করা কীটনাশক মিশানো ভালো হবে। এছাড়া মাটি এসিডিক (অম্ল) হলে ৫০০ গ্রাম ডলোচুন এবং তলার মাটি বেশি শক্ত হলে ৫০০ গ্রাম লবণ মিশাতে হবে।
এটি করার জন্য উপযুক্ত সময় হলো মধ্য জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য আশ্বিন মাস (জুন থেকে সেপ্টেম্বর)। প্রকৃত খাটো জাতের জন্য (৬ মি.×৬ মি.) দূরত্ব, আংশিক খাটো জাতের (৬ মি. ×৭ মি.), এবং লম্বা বা আমাদের দেশি উন্নত জাতের ক্ষেত্রে (৭ মি.×৭ মি.) দূরত্বে নারিকেল চারা লাগানো ভালো। চারা রোপণের ২-৩ সপ্তাহ আগে ‘লে আউট প্লান’ অনুসরণ করে নির্ধারিত স্থানে গর্ত তৈরি করে নিয়ে তাতে সার প্রয়োগ করে নেওয়া উত্তম হবে।
নারকেল চারা
নারকেল গাছ রোপণ থেকে ফল পেতে তুলনামূলকভাবে একটি দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তাই উন্নতমানের ও ভালো জাতের গাছে থেকে বীজ নিয়ে চারা তৈরি করতে হবে। আপনার নিজের বা প্রতিবেশীর কারো ভালো মানের ও প্রচুর ফল ধরে এমন গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে পারেন। পাকা নারকেল বেলেমাটিতে রেখে মাঝে মাঝে পানি দিলে কিছু দিনের মধ্যেই চারা গজাবে। গজানো চারাগুলো ৮-৯ মাস পরেই লাগানো যাবে। নির্বাচিত চারা বীজতলা থেকে শাবল দিয়ে সাবধানে তুলতে হবে। টেনে তোলা যাবে না। এতে শিকড় ছিঁড়ে যেতে পারে। চারা তোলার পর এক সপ্তার মধ্যেই তা রোপণ করতে হবে। নারকেলের সম্পূর্ণ অংশ মাটিরে পুতে না দিয়ে কিছু অংশ মাটির উপরে রাখতে হবে।
ওজন কমনো থেকে ত্বকের যত্ন, লাউয়ের যত স্বাস্থ্যগুণ
সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা
অন্যান্য গাছের তুলনায় নারকেল গাছে সার ও পানি সেচ, নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিকমতো হলে গাছের বৃদ্ধি খুব ভালো হয়। অন্য খাদ্যের তুলনায় এ গাছে পটাশ জাতীয় খাবারের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। সাধারণত সুপারিশকৃত সার বছরে দু’বার (বর্ষার আগে ও পরে) সার প্রয়োগ প্রচলন আছে।
| ক্রঃ নং | আইটেম | ১ম বছর | ২য় বছর | ৩য় বছর | ৪থ বছর ও ঊর্ধে |
| ১ | পচা গোবর/আবজনা পচা সার (কেজি) | ৪০ | ২৫ | ২৫ | ৩০ |
| ২ | ছাই (কেজি) | ১০ | ১০ | ১০ | ১০ |
| ৩ | মুরগি লিটার পচা (কেজি) | ১৬ | ১৬ | ১৬ | ১৬ |
| ৪ | হাড়ের গুঁড়া/শুটকি মাছের গুঁড়া (কেজি) | ২ | ২ | ২ | ২ |
| ৫ | ইউরিয়া (গ্রাম) | ৬০০ | ১২০০ | ১৪০০ | ১৬০০ |
| ৬ | টিএসপি (গ্রাম) | ৩০০ | ৪০০ | ৬০০ | ৮০০ |
| ৭ | এমওপি (গ্রাম) | ৪০০ | ৬০০ | ১০০০ | ১৫০০ |
| ৮ | ম্যাগনেশিয়াম সালফেট (গ্রাম) | ১০০ | ১৫০ | ১৫০ | ১৫০ |
| ৯ | বোরন গ্রাম | ৫০ | ১০০ | ১০০ | ১০০ |
চারা রোপণের ৩ মাস পর লাগানো চারার গোড়া থেকে ২০ সেমি. দূরে ২০ সেমি. চওড়া ও ১০ সেমি. গভীর করে যেসব সার প্রয়োগ করতে হবে তা হলো পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার ১০ কেজি, ইউরিয়া ১২৫ গ্রাম, ১০০ গ্রাম এবং এমওপি সার ২৫০ গ্রাম। এ সারগুলো ৩ মাসের ব্যবধানে আরও দুইবার প্রয়োগ করতে হবে। তবে পরের প্রতিবার গাছের গোড়া থেকে কিছু দূরে (৫-৭) সেমি. গাছের গোড়ার চারদিকে নালা তৈরি করে একইভাবে প্রয়োগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিবার সার প্রয়োগ শেষে ২ বালতি পানি দিয়ে গোড়া ভালোভাবে ভেজাতে হবে। খাটো গাছের নারিকেল সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ, পানি সেচ, পানি নিকাশ ও পরিচর্যা গ্রহণ করলে চারা রোপণের ৩-৪ বছর থেকেই ফুল-ফল ধরা আরম্ভ করবে। চতুর্থ বছরে জন্য যে সার সুপারিশ করা গেল তা পরবর্তী বছরগুলোতে প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। চারা রোপণের পর থেকে চার বছর পর্যন্ত বছর বছর ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ও বোরন ৬ মাসের ব্যবধানে বছরে দুইবার প্রয়োগ যোগ্য।
ওজন কমনো থেকে ত্বকের যত্ন, লাউয়ের যত স্বাস্থ্যগুণ
নারিকেল বাগান বিশেষ করে গাছের গোড়ার চারধার সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। প্রথম ২ বছর গাছের গোড়া থেকে ৬০-৭০ সেমি. দূর পর্যন্ত বৃত্তাকারে চারদিকের অংশে কচুরিপানা শুকিয়ে ছোট করে কেটে ৮-১০ সেমি. পুরু করে মালচিং দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে গাছের গোড়া ঠাণ্ডা থাকবে, আগাছা জন্মাবে না, মাটির রস সংরক্ষিত থাকবে এবং পরবর্তীতে এগুলো পচে জৈবসার হিসাবে কাজ করবে। তবে এভাবে মালচিং দেয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন তা একেবারে গাছের কাণ্ডকে স্পর্শ না করে, গাছের গোড়ার অংশ কমপক্ষে ৮-১০ সেমি. ফাঁকা রাখতে হবে। বিকল্প হিসাবে চীনাবাদামের খোসা, ধানের তুষ, আখের ছোবড়া, কাঠের গুঁড়া, নারিকেলের ছোবড়া, গাছের শুকনা পাতা, সমুদ্রের শ্যাওলা, বিভিন্ন খড়-কুটা, লতাপাতা মালচিং হিসাবে ব্যবহার করা যাবে। মালচিং অবস্থায় অনেক সময় উঁই পোকাসহ অন্যান্য পোকা মালচিং ব্যবস্থাকে আবাসন হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এ জন্য সেভিন, ইমিটাপ, রিজেন্ট, ডারসবান ইত্যাদি দলীয় যে কোনো কীটনাশক দিয়ে ১০-১৫ দিন পর পর স্প্রে করা হলে পোকার আবাসন ধ্বংস হবে। গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকা অথবা মাটিতে রস কমে গেলে উভয় ক্ষেত্রেই নারিকেল গাছ অত্যন্ত কষ্ট পায়। এ জন্য বর্ষাকালে গাছ যেন কোনো মতেই জলাবদ্ধতার (Water lodging) কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এজন্য ঠিকমতো নালা কেটে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া খরা মৌসুমে নারিকেল বাগানের মাটিতে যেন পরিমিত রস থাকে এ জন্য ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে নিয়মিত সেচ দিতে হবে।